গ্রেফতার হওয়ার মাত্র আড়াই মাসের মধ্যেই সাহেদকে যাবজ্জীবন সাজা

বাংলাদেশ

অনলাইন ডেস্ক: গ্রেফতার হওয়ার মাত্র আড়াই মাসের মধ্যেই অস্ত্র মামলায় যাবজ্জীবন সাজা দেয়া হয়েছে দুুর্ধর্ষ প্রতারক ও রিজেন্ট সাহেদ করিম ওরফে মোহাম্মদ সাহেদকে। তার বিরুদ্ধে অস্ত্র আইনে করা এক মামলায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের আদেশ দিয়েছে আদালত।

সোমবার ঢাকা মহানগর দায়রা জজ কে এম ইমরুল কায়েশ এ আদেশ দেন। ১৮৭৮ সালের অস্ত্র আইনের ১৯ (এ) ধারায় করা মামলায় সাহেদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হয়। এছাড়া অস্ত্র আইনের ১৯ (এফ) ধারায় তার সাত বছরের কারাদণ্ডের আদেশ দেয় আদালত। উভয় সাজা একসঙ্গে চলবে বলে আদালত রায়ে উল্লেখ করে। রায়ে সন্তুষ্টি প্রকাশ করে ঢাকা মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটর আব্দুল্লাহ আবু বলেন, সাহেদ যে অপরাধী তা মামলার রায়ে প্রমাণিত হয়েছে। এ রায় সমাজে দৃষ্টান্ত হিসেবে থাকবে। এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর তাপস কুমার পাল বলেন, সাহেদ নিজ হেফাজতে অবৈধ পিস্তল রাখায় যাবজ্জীবন ও গুলি রাখায় সাত বছরের কারাদণ্ডের আদেশ দেয় আদালত। রায়ে আমরা সন্তুষ্ট। সাহেদের আইনজীবী মনিরুজ্জামান বলেন, এ রায়ে আমরা সন্তুষ্ট হতে পারিনি। রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে যাব। আমাদের কোর্ট রিপোর্টার জানিয়েছেন, রায়ের পর্যবেক্ষণে বিচারক বলেন, আমাদের সমাজে সাহেদের মতো ভদ্রবেশে অনেক লোক রয়েছে। এ মামলার রায় এর দৃষ্টান্ত হিসেবে কাজ করবে।

সাহেদ ২০ লাখ টাকা লোন নিয়ে গাড়িটি ক্রয় করে। কিন্তু সে আদালতের কাছে তা স্বীকার করেনি। সাহেদ তা জানা সত্ত্বেও আদালতের কাছে মিথ্যা তথ্য দেয়। সাহেদ অত্যন্ত চালাক ও ধুরন্ধর ব্যক্তি। সাহেদের গাড়িতে অস্ত্র রাখার বিষয়টি প্রমাণ হওয়ায় সে আদালতের কাছে কোন অনুকম্পা পেতে পারে না। এদিন রায় ঘোষণার আগে সাহেদকে কারাগার থেকে আদালতে হাজির করা হয়। মামলায় ১৪ সাক্ষীর মধ্যে বিভিন্ন সময়ে ১১ জন আদালতে সাক্ষ্য দেয়। তবে এর আগে এ মামলায় নিজেকে সম্পূর্ণ নির্দোষ দাবি করে ন্যায়বিচার চেয়েছে রিজেন্ট হাসপাতাল ও রিজেন্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান মোঃ সাহেদ।

গত ১৬ সেপ্টেম্বর ঢাকা মহানগর দায়রা জজ কে এম ইমরুল কায়েশের আদালতে আত্মপক্ষ সমর্থনে সে এ দাবি করে। সাহেদ বলে, আমার কাছ থেকে কোন অস্ত্র উদ্ধার করা হয়নি। আমি সম্পূর্ণ নির্দোষ। আমি আদালতের কাছে ন্যায়বিচার চাই।

এরপর বিচারক তাকে সাফাই সাক্ষী দেবে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে সাহেদ বলে, আমি সাফাই সাক্ষী দেব না। এরপর আদালত যুক্তি উপস্থাপন শুনানির জন্য ১৭ সেপ্টেম্বর দিন ধার্য করে। এর আগে গত ২৭ আগস্ট ঢাকা মহানগর দায়রা জজ কে এম ইমরুল কায়েশ সাহেদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন। এ মামলায় ১১ জন সাক্ষীর জবানবন্দী গ্রহণ করা হয়েছে।

গত ৬ জুলাই র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালতের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারোয়ার আলমের নেতৃত্বে রিজেন্ট হাসপাতালের উত্তরা ও মিরপুর কার্যালয়ে অভিযান চালানো হয়। পরীক্ষা ছাড়াই করোনার সনদ দিয়ে সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রতারণা ও অর্থ হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ ছিল এই হাসপাতালের বিরুদ্ধে। র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত অন্তত ছয় হাজার ভুয়া করোনা পরীক্ষার সনদ পাওয়ার প্রমাণ পায়। একদিন পর গত ৭ জুলাই স্বাস্থ্য অধিদফতরের নির্দেশে র‌্যাব রিজেন্ট হাসপাতাল ও তার মূল কার্যালয় সিলগালা করে দেয়। রিজেন্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান সাহেদসহ ১৭ জনের বিরুদ্ধে ওই দিনই উত্তরা পশ্চিম থানায় নিয়মিত মামলা দায়ের করা হয়। ওই অভিযানে ভুয়া করোনা পরীক্ষার রিপোর্ট, করোনা চিকিৎসার নামে রোগীদের কাছ থেকে অর্থ আদায়সহ নানা অনিয়ম উঠে আসে। এ ঘটনার পর পালিয়ে যায় সাহেদ। ১৫ জুলাই সাহেদকে সাতক্ষীরার সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে গ্রেফতার করে র‌্যাব। পরে তাকে হেলিকপ্টারে সাতক্ষীরা থেকে ঢাকায় আনা হয়।

করোনা পরীক্ষার নামে ভুয়া রিপোর্টসহ বিভিন্ন প্রতারণার অভিযোগে দায়ের করা মামলায় ১৬ জুলাই সাহেদকে ১০ দিনের রিমান্ডে নেয়া হয়। এরপর ১৯ জুলাই তাকে নিয়ে উত্তরার বাসার সামনে অভিযান চালায় ডিবি পুলিশ। সেখানে সাহেদের নিজস্ব সাদা প্রাইভেটকার থেকে পাঁচ বোতল বিদেশি মদ, ১০ বোতল ফেনসিডিল, একটি পিস্তল এবং একটি গুলি উদ্ধার করা হয়। এরপর উত্তরা পশ্চিম থানায় অস্ত্র ও মাদক নিয়ন্ত্রণ আইনে দুটি মামলা করা হয়।

৩০ জুলাই ঢাকা মহানগর হাকিম আদালতে সাহেদের বিরুদ্ধে অস্ত্র আইনের মামলায় চার্জশীট দাখিল করা হয়। এরপর ২৭ আগস্ট তার বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে আদালত। ২০ সেপ্টেম্বর রাষ্ট্র ও আসামিপক্ষের যুক্তি উপস্থাপন শেষে রায় ঘোষণার জন্য ২৮ সেপ্টেম্বর দিন ধার্য করেন ঢাকা মহানগর দায়রা জজ কে এম ইমরুল কায়েশ। মামলাটির আট কার্যদিবসে বিচারিক কার্যক্রম শেষ করা হয়।

উল্লেখ্য সাহেদের বিরুদ্ধে সারাদেশে অর্ধশত মামলা রয়েছে। এর বেশিরভাগই প্রতারণার অভিযোগে করা। এ ছাড়া সাহেদসহ চার জনের বিরুদ্ধে এনআরবি ব্যাংকের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে মামলা দায়ের করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

গত ২২ জুলাই দুদকের সহকারী পরিচালক মোঃ সিরাজুল হক বাদী হয়ে মামলাটি দায়ের করেন। ঢাকার সমন্বিত জেলা কার্যালয়ে দণ্ডবিধির ৪০৯/৪২০/১০৯ ধারাসহ ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারায় মামলাটি দায়ের করা হয়েছে। মামলার আসামিরা হচ্ছে রিজেন্ট হাসপাতালের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাহেদ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোঃ ইব্রাহিম খলিল, এনআরবি ব্যাংকের এসই ব্যাংকিংয়ের সাবেক প্রিন্সিপাল অফিসার মোঃ সোহানুর রহমান ও ভাইস প্রেসিডেন্ট ওয়াহিদ বিন আহমেদ। হাসপাতাল পরিচালনার পূর্ব অভিজ্ঞতা, অন্য ব্যাংকের লেনদেন বা বিনিয়োগের তথ্য যাচাই, ঋণ নিরাপত্তার পর্যাপ্ত জামানত সংগ্রহ না করেই সাহেদকে দুই দফায় ২ কোটি ৪ লাখ ৯০ হাজার ৯৮৭ টাকা ঋণ দেয় ব্যাংকটি। ঋণ নেয়ার পর এই টাকা আর পরিশোধ করেনি সাহেদ। টাকা পরিশোধ না করায় সুদ এবং অন্যান্য চার্জসহ সাহেদের কাছে ব্যাংকের পাওনা হয়েছে ২ কোটি ৭০ লাখ ৭০ হাজার ২১৪ টাকা। তবে ঋণ মঞ্জুরির শর্তানুযায়ী এক কোটি টাকা এফডিআর করেছিল সে। দুই টার্মে দুই কোটি টাকা ঋণ পাবে তা নিশ্চিত হওয়ার পরই এই এফডিআর করে। ব্যাংক কর্তৃপক্ষ টাকা উদ্ধার করতে না পারায় তার এফডিআর থেকে এক কোটি ১৮ লাখ ৮৯ হাজার ৩৪৯ টাকা সমন্বয় করে। বর্তমানে সাহেদের কাছে ব্যাংকটির পাওনা আছে এক কোটি ৫১ লাখ ৮১ হাজার ৩৬৬ টাকা। চার আসামি পরস্পর যোগসাজশে এই টাকা আত্মসাত করেছে বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। টাকা আত্মসাতের প্রমাণ পাওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *