ছবির কপিরাইট: GETTY IMAGES

‘ভারত-চীনের সীমান্ত পুরোটাই মায়া, এলএসি আছে অন্তত চারটে’

আন্তর্জাতিক

চীন-ভারত সীমান্তে অবস্থিত বিতর্কিত গালওয়ান উপত্যকার ওপর বেইজিং তাদের পূর্ণ সার্বভৌমত্ব দাবি করার পর দুদেশের সীমান্ত আলোচনা পুরোপুরি থমকে যেতে পারে বলে ভারতে অনেক পর্যবেক্ষকই আশঙ্কা করছেন।

ওই উপত্যকায় গত সোমবার রাতে কুড়িজন ভারতীয় সেনা নিহত হওয়ার পরই চীন আনুষ্ঠানিকভাবে ওই দাবি জানিয়েছে, যেটাকে ভারত ‘অতিরঞ্জিত ও অগ্রহণযোগ্য’ বলে বর্ণনা করছে।

ইতিমধ্যে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীও ঘোষণা করেছেন চীন ভারতের কোনও ভূখন্ডই দখল করতে পারেনি। এই পটভূমিতে আলোচনার মাধ্যমে দুদেশের সীমান্ত বিরোধ মেটার সম্ভাবনা কতটুকু?

সোমবার রাতে যে গালওয়ান উপত্যকায় চীন ও ভারতের সেনাদের প্রাণঘাতী সংঘর্ষ হয়েছিল, প্রায় ছয় দশক আগে ১৯৬২ সালে ভারত ও চীনের মধ্যেকার যুদ্ধেরও সূচনা হয়েছিল ঠিক একই জায়গা থেকে।

‘৬২র অক্টোবরে গালওয়ান উপত্যকায় ৩৬ জন ভারতীয় সেনা চীনা বাহিনীর হাতে নিহত হওয়ার পরই পুরোদস্তুর যুদ্ধ শুরু হয়ে গিয়েছিল।

গালওয়ানের ম্যাপ ফিরিয়ে নিয়েছিল চীন

কিন্তু পরবর্তী আটান্ন বছরে চীন কিন্তু সেভাবে ওই ভূখন্ডটির ওপরে কোনও দাবি জানায়নি, সেখানে কোনও সেনা স্থাপনাও তৈরি করেনি বা সেনা মোতায়েনও করেনি।

ভারতের সাবেক পররাষ্ট্র সচিব নিরুপমা রাওভারতের সাবেক পররাষ্ট্র সচিব নিরুপমা রাও

ভারতের সাবেক পররাষ্ট্র সচিব নিরুপমা রাও বিবিসিকে বলছিলেন, “প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা বা এলএসি বরাবর এই জায়গাটির আগেও সংঘর্ষের ইতিহাস আছে। এখন জায়গাটি কতটা বিতর্কিত, প্রশ্ন সেটাই।”

“২০০২-০৩ সাল নাগাদ চীন ও ভারতের মধ্যে সরকারি পর্যায়ে যে সীমান্ত আলোচনা শুরু হয়েছিল, তখন ওই উপত্যকা-সহ পুরো এলাকাটাকে কে কীভাবে দেখে, তা নিয়ে দুদেশের মধ্যে মানচিত্র বিনিময়ও হয়েছিল।”

“কিন্তু কে জানে কেন, ভাল করে কেউ কিছু দেখে ওঠার আগেই মাত্র কুড়ি মিনিটের মধ্যে চীন তাদের দেওয়া মানচিত্র প্রত্যাহার করে নেয়।”

ফলে এখন পুরো গালওয়ান উপত্যকার ওপর দাবি জানানো হলেও এই ভৌগোলিক অঞ্চলটির ওপর কতটা আর কীভাবে দাবি জানানো হবে, তা নিয়ে চীনের মধ্যেও বহু বছর ধরে সম্ভবত একটা দ্বিধা কাজ করেছে।

‘চারটে এলএসি থাকলে মারামারি তো হবেই’

ভারতীয় সেনার সাবেক মেজর জেনারেল ও স্ট্র্যাটেজিক অ্যানালিস্ট দীপঙ্কর ব্যানার্জি মনে করেন, চীন-ভারত সীমান্তটা ওখানে একেবারেই সুচিহ্নিত ও সুনির্দিষ্ট নয় বলেই যাবতীয় সংঘাতের সূত্রপাত।

তিনি বলছিলেন, “আসলে সমস্যাটা হল প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা বা এলএসি বলেই কিছু নেই। পুরো জিনিসটাই একেবারে ধারণাভিত্তিক – যাকে বলে মায়া!”

“বছরদুয়েক আগেও সীমান্ত আলোচনায় ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন, এমন একজন সিনিয়র জেনারেল বেইজিং থেকে ফিরে আমায় বলেছিলেন, তিনি উপলব্ধি করেছেন এলএসি আসলে একটা নয় – চারটে!”

এই চারটে এলএসি কী রকম? দীপঙ্কর ব্যানার্জি জানাচ্ছেন:

  • একটা, ভারত যেটাকে সীমান্তরেখা বলে মনে করে
  • দ্বিতীয় হল, চীন যেটাকে সীমান্তরেখা মনে করে বলে ভারতের ধারণা!
  • তৃতীয় হল, চীন যেটাকে নিজেদের সীমান্তরেখা বলে মনে করে
  • চার নম্বর হল, ভারতে যেটাকে সীমান্তরেখা মনে করে বলে চীনের ধারণা!

“ফলে এই রকম একটা বিভ্রান্তিকর পরিস্থিতিতে দুপক্ষের মধ্যে এরকম হাতাহাতি লড়াই হওয়াটা খুবই স্বাভাবিক”, বলছিলেন ওই সাবেক সেনা কর্মকর্তা।

কিন্তু এখন গালওয়ানের ওপর চীন আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের দাবি পেশ করার পর শুধু মারামারি বা হাতাহাতি নয় – দুদেশের মধ্যে কূটনৈতিক আলোচনা বা সীমান্ত বিরোধ নিরসনের বৈঠকও ভেস্তে যেতে পারে দিল্লিতে পর্যবেক্ষকরা অনেকে আশঙ্কা করছেন।

ডিবিও-গামী রাস্তাটাই সংঘাতের মূলে?

এই আশঙ্কা আছে চীনের দিকেও – কিন্তু তারপরও কেন তারা এতদিন বাদে পুরো গালওয়ান উপত্যকাটা কব্জা করতে চাইছে?

অধ্যাপক শ্রীমতি চক্রবর্তী
অধ্যাপক শ্রীমতি চক্রবর্তী

দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও ইনস্টিটিউট অব চায়না স্টাডিজের ফেলো শ্রীমতি চক্রবর্তী বলছিলেন, “একটা কারণ হতে পারে ভারত এতদিন পর দৌলত বেগ ওল্ডি (ডিবিও) অভিমুখে যে রাস্তাটা বানাচ্ছে, চীন হয়তো মনে করছে গালওয়ান ভ্যালিটা নিতে পারলে ওই রাস্তাটাকে ‘নিউট্রালাইজ’ করে দেওয়া যাবে।”

“ভারত যদিও রাস্তাটা সম্পূর্ণভাবে নিজেদের ভূখন্ডের ভেতরেই বানিয়েছে, তারপরেও বোঝাই যাচ্ছে চীনের সেটা নিয়ে আপত্তি আছে।”

“গালওয়ানে সেনা মোতায়েন করে তারা সম্ভবত ওই রাস্তাটাকেই নিজেদের নিশানায় রাখতে চায়”, বলছিলেন ড: চক্রবর্তী।

ফলে ডারবুক-শিয়ক থেকে দৌলত বেগ ওল্ডি পর্যন্ত সীমান্ত ঘেঁষে ভারত যে আড়াইশো কিলোমিটারেরও বেশি লম্বা নতুন রাস্তা বানিয়েছে, সেটাই ওই গালওয়ানের স্ট্র্যাটেজিক গুরুত্বকে আমূল বদলে দিয়েছে বলে অনেকেই মনে করছেন।

আর এর পরিণতিতেই সম্ভবত চীন তাদের অবস্থান এত কঠোর করেছে এবং এতদিন যেভাবে আলোচনার টেবিলে বসে দুই দেশ তাদের সীমান্ত সমস্যা মেটানোর চেষ্টা করছিল তাতে আর কোনও কাজ হবে কি না তা নিয়েও সন্দেহ দেখা দিয়েছে।

ছবির কপিরাইট: GETTY IMAGES

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *