সীমান্ত হত্যা বন্ধে দৃঢ় প্রতিশ্রুতি, বিজিবি-বিএসএফ সম্মেলন শেষে যৌথ ঘোষণা

বাংলাদেশ

অনলাইন ডেস্ক:

বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে হত্যা ও মারধরের ঘটনা শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে আবারো প্রতিশ্রুতি দিয়েছে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বিএসএফ। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) যৌথ টহল জোরদারে গুরত্বারোপ করায় তাতে সম্মত হয়েছে বিএসএফ।
বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) সদর দপ্তর পিলখানায় ১৬ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হওয়া সীমান্ত সম্মেলনের শেষ দিনে গতকাল শনিবার বিজিবি-বিএসএফ প্রধান যৌথ ঘোষণা দেন। সম্মেলনে নেতৃত্বদানকারী বিজিবি মহাপরিচালক মেজর জেনারেল সাফিনুল ইসলাম এবং বিএসএফের মহাপরিচালক রাকেশ আস্থানা যৌথ ঘোষণায় বলেন, সীমান্তহত্যা শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা, মাদকদ্রব্য, অবৈধ অস্ত্র, মানবপাচার রোধ এবং মানবাধিকার রক্ষায় বিজিবি-বিএসএফ সম্মত হয়েছে।

সীমান্ত হত্যাকে অপ্রত্যাশিত উল্লেখ করে বিএসএফ মহাপরিচালক রাকেশ আস্থানা বলেন, সীমান্তে হত্যাকাণ্ড শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে আমরা দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। এ বিষয়ে বিজিবির সঙ্গে আমাদের প্রতিনিয়ত আনুষ্ঠানিক-অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। সীমান্তে ‘নন লিথ্যাল’ (প্রাণঘাতী নয় এমন) অস্ত্র ব্যবহারে আমাদের স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। একেবারে প্রাণ সংশয়ে না পড়লে লিথ্যাল অস্ত্র ব্যবহার না করতে বলা হয়েছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মাদক-পশু-অস্ত্র চোরাচালানসহ নানা ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রে দুর্ভাগ্যবশত এ ধরনের ঘটনা ঘটছে। তবে সন্ত্রাসীদের গতিবিধির ওপর নজরদারি চালাতে আমাদের দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যেই গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সন্ত্রাসীদের কোনো দেশ নেই মন্তব্য করে তিনি আরো বলেন, ‘প্রায় ৭০ ভাগ মৃত্যুই রাতের বেলা অর্থাৎ রাত ১০টা থেকে ভোর ৫টার মধ্যে ঘটে থাকে। এ সময় সাধারণত নানা ধরনের সন্ত্রাসী কার্যক্রমই ঘটে থাকে। তখন সন্ত্রাসীরা বিএসএফ সদস্যদের চ্যালেঞ্জ করে বসে। এছাড়া রাতের বেলা আবহাওয়া অনুকূলে থাকে না, যাতে সবকিছু দৃশ্যমানও থাকে না। এমন ৬০ ভাগের বেশি ঘটনায় বিএসএফ সদস্যরা আক্রান্ত হচ্ছেন এবং ৫২ জন বিএসএফ সদস্য বিভিন্ন আক্রমণে আহত হয়েছেন দাবি করে রাকেশ আন্তানা বলেন, শুধু আক্রান্ত হলেই বিএসএফ লিথ্যাল অস্ত্র ব্যবহার করে।’
সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের জন্যই সীমান্ত হত্যা বেড়েছে মন্তব্য করে বিএসএফ মহাপরিচালক বলেন, ‘আমাদের দুই দেশের মধ্যেই বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বিদ্যমান রয়েছে। আমরা সীমান্তে বিজিবি-বিএসএফ সমন্বয়ে জয়েন্ট পেট্রোলিংয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। করোনা পরিস্থিতির কারণে এটা বেশ কিছুদিন ধরে বন্ধ রয়েছে। তবে এটা আমরা আবারও ব্যাপকভাবে শুরু করতে চাই। আমরা সীমান্তে মৃত্যু শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে কমিটেড।’

সম্প্রতি ঠাকুরগাঁওয়ে সকালে নদীতে মাছ ধরতে গিয়ে বিএসএফের গুলিতে এক বাংলাদেশি নিহত হওয়ার বিষয়ে বিএসএফ প্রধান বলেন, ‘দিনে কিংবা রাতে যখনই এমন ঘটনা ঘটে, প্রত্যেকটি ঘটনাতেই আমাদের অভ্যন্তরীণ তদন্ত হয়। প্রত্যেকটা ঘটনা খতিয়ে দেখা হয়। এ বিষয়টিও তদন্ত করে ভবিষ্যতের জন্য ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

সীমান্ত হত্যার বিষয়ে বিজিবি মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মো. সাফিনুল ইসলাম বলেন, ‘বেশিরভাগ ঘটনাই রাতে ঘটে। সন্ত্রাসী কার্যক্রমের জন্য কেউ বর্ডার ক্রস করে ভারতে প্রবেশ করলে এ ধরনের ঘটনা ঘটে। এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে আমরা আবারও সীমান্তে যৌথ টহল শুরু করবো।’ মাদক চোরাচালানের বিষয়ে বিজিবি প্রধান বলেন, ‘মাদকের বিষয়ে আমরা উভয়পক্ষ কনসার্ন। উভয়েই তথ্য আদান-প্রদান করে মাদক চোরাচালান প্রতিরোধে কাজ করে যাচ্ছি।’ মাদকের চোরাচালান সংক্রান্ত এক প্রশ্নে বিএসএফ প্রধান বলেন, ‘ভারতীয় সীমান্ত ব্যবহার করে ফেনসিডিল, ইয়াবাসহ নানা ধরনের মাদক বাংলাদেশে প্রবেশ করে। মাদকের চালান প্রতিরোধে বিএসএফসহ ভারতীয় অন্যান্য আইন প্রয়োগকারী সংস্থাও সচেষ্ট রয়েছে। আমাদের সম্মিলিত তৎপরতায় সীমান্তে বিপুল পরিমাণ মাদক ধরা পড়ছে। মাদকের চালান শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতেও কাজ করে যাচ্ছি।’
সম্মেলনে যেসব উল্লেখযোগ্য সিদ্ধান্ত হয়েছে: সীমান্তে উভয় দেশের নিরস্ত্র নাগরিক হত্যা/আহত বা মারধরের ঘটনা শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে ঝুঁকিপূর্ণ সীমান্তবর্তী এলাকায় যৌথ টহল বাড়ানো, জনসচেতনতামূলক কর্মসূচি আরো বেগবান করা এবং প্রয়োজনীয় আর্থ-সামাজিক উন্নয়নমূলক কর্মসূচি গ্রহণসহ সীমান্তে অতিরিক্ত সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণে উভয় পক্ষই সম্মত হয়েছেন। সমন্বিত কার্যক্রম গ্রহণের পাশাপাশি সীমান্ত এলাকায় নাগরিকদের মধ্যে আন্তর্জাতিক সীমানা আইনের বিধি-বিধান সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টির মাধ্যমে সীমান্তে আক্রমণ-হামলার ঘটনাও শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে উভয় পক্ষই সম্মত হয়েছেন।
সমন্বিত সীমান্ত ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা (সিবিএমপি) বাস্তবায়নের মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের আন্তঃসীমান্ত অপরাধ দমনের লক্ষ্যে নির্ধারণ করা হয়েছে। উভয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী উপকৃত হবে এমন তাৎক্ষণিক ও দরকারি তথ্য বিশেষ করে অধিকতর তদন্তের জন্য আগ্নেয়াস্ত্র চোরাকারবারিদের ডিজিটাল ফটোগ্রাফ পরস্পরের মধ্যে শেয়ার করতে উভয় পক্ষই সম্মত হয়েছেন। মানবপাচার ও অবৈধভাবে আন্তর্জাতিক সীমানা অতিক্রম করা প্রতিরাধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের বিষয়ে উভয় পক্ষ সম্মত হন। উভয় মহাপরিচালক যার যার দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী মানবপাচারে ক্ষতিগ্রস্তদের যত দ্রুত সম্ভব তাদের উদ্ধার ও পুনর্বাসনের সুবিধার্থে সহায়তা করতেও সম্মত হয়েছেন। উভয় পক্ষই আন্তর্জাতিক সীমানার কাঁটাতারের বেড়া কেটে অপসারণ করা বা বেড়ার ক্ষয়ক্ষতি রোধে যৌথ প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে এবং নিয়মিত যৌথ টহল চালিয়ে যেতে সম্মত হয়েছেন। অবৈধভাবে সীমানা অতিক্রম করা থেকে সীমান্তবর্তী জনসাধারণকে বিরত রাখতে সম্মত হয়েছেন এবং একইসঙ্গে উভয় বাহিনীর সদস্যদের মাধ্যমে সীমান্তের অলঙ্ঘনীয়তা বজায় রাখার বিষয়ে আশ্বাস দিয়েছেন।

সাম্প্রতিক সময়ে মানসিক ভারসাম্যহীন ব্যক্তিদের জোরপূর্বক পুশইন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তাদের জাতীয়তা যাচাই করতে এবং একে অপরের সহযোগিতায় হস্তান্তর বা গ্রহণ প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে উভয় পক্ষই সম্মত হয়েছেন। বিএসএফ মহাপরিচালক সন্দেহভাজন ভারতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বিজিবি ও বাংলাদেশের অন্য বাহিনীর গৃহীত পদক্ষেপের প্রশংসা করেন এবং বাংলাদেশে ভারতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীর সম্ভাব্য অবস্থান ধ্বংস করতে বিজিবির অব্যাহত সহযোগিতা প্রত্যাশা করেন।

বিজিবি মহাপরিচালকও আশ্বস্ত করেন, বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ভারতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীর কোনো ক্যাম্প বা আস্তানা নেই। বাংলাদেশ কখনো তার ভূমি কোনো সন্ত্রাসী গোষ্ঠী বা অন্য কোনো রাষ্ট্রের বিশেষ করে ভারতের কোনো শত্রু পক্ষকে ব্যবহারের সুযোগ দেয়নি এবং ভবিষ্যতেও দেবে না। তিনি এ ব্যাপারে সম্ভাব্য সব ধরনের সহায়তার আশ্বাস দেন। উভয় পক্ষ সীমান্তে অস্ত্র, গোলাবারুদ, বিস্ফোরক দ্রব্য, মাদক, স্বর্ণ ও জালমুদ্রা পাচার প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণে সম্মত হয়েছেন। সীমান্ত চোরাচালানিী দ্রব্যসহ আটক ব্যক্তিদের সম্পর্কে তাৎক্ষণিক তথ্য এবং উভয় বাহিনীর প্রয়োজন অনুযায়ী প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের প্রতিবেদন বিনিময়ের বিষয়ে উভয় পক্ষ সম্মত হয়েছেন।

বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলে বিজিবির অতিরিক্ত মহাপরিচালক ও বিজিবি সদর দপ্তরের সংশ্লিষ্ট স্টাফ অফিসার ছাড়াও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, যৌথ নদী কমিশন এবং ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা প্রতিনিধিত্ব করেন। ভারতীয় প্রতিনিধিদলে বিএসএফ সদর দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং ভারতের স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা ছিলেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *